গৌতম বুদ্ধ ধর্মোপদেশ দেওয়ার সময় বিভিন্ন সূত্র ও নীতিগাথা ভাষণ করেছেন। এসব সূত্র ও নীতিগাথায় মঙ্গলকর্ম সম্পাদন এবং নৈতিক জীবনযাপনের নির্দেশনা আছে। ত্রিপিটকের অন্তর্গত সূত্রপিটকে মূলত নীতিগাথাসমূহ সংরক্ষিত আছে। এ অধ্যায়ে খুদ্দকপাঠ ও ধর্মপদ গ্রন্থের পরিচিতি, মঙ্গলসূত্র ও দণ্ডবর্গের পটভূমি এবং বিষয়বস্তু পড়ব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- খুদ্দকপাঠ ও ধর্মপদ গ্রন্থের পরিচিতি প্রদান করতে পারব;
- মঙ্গলসূত্র বাংলা অর্থসহ পালি ভাষায় বলতে পারব;
- মঙ্গল সূত্রের পটভূমি এবং কীসে মঙ্গল হয় তা ব্যাখ্যা করতে পারব;
- দণ্ডবর্গের বিষয়বস্তু বর্ণনা করতে পারব;
- দণ্ডবর্গ অনুসারে দণ্ডের পরিণাম মূল্যায়ন করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সুজিত বড়াল দণ্ডপ্রাপ্ত হয়। সে মনে করে এতে তার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। সে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং কখনো অপরাধ করবে না বলে পণ করে।
বুদ্ধের ধর্মোপদেশসমূহ ত্রিপিটকের বিভিন্ন গ্রন্থে সংরক্ষিত আছে। বুদ্ধ দেশিত সূত্রসমূহ ত্রিপিটকের অন্তর্গত সূত্রপিটকে পাওয়া যায়। খুদ্দকপাঠ হচ্ছে সূত্রপিটকের অন্তর্গত খুদ্দক নিকায়ের প্রথম গ্রন্থ। 'খুদ্দকপাঠ' শব্দের অর্থ হচ্ছে ক্ষুদ্র বা সংক্ষিপ্ত পাঠ। খুদ্দকপাঠ গ্রন্থে মঙ্গলসূত্র পাওয়া যায়। ধর্মপদ ও খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত দ্বিতীয় গ্রন্থ। ধর্মপদে বুদ্ধ ভাষিত বিভিন্ন গাথা পাওয়া যায়। ধর্মপদের অর্থ সঠিক পথ বা ধর্মের পথ। এ গ্রন্থের গাথাগুলো মানুষকে ধর্মের পথে বা সঠিক পথে পরিচালিত করে। তাই এ গ্রন্থের নাম ধর্মপদ। ধর্মপদে ২৬টি অধ্যায়ে ৪২৩টি গাথা আছে। এ অধ্যায়ে আমরা খুদ্দকপাঠের 'মঙ্গলসূত্র' এবং ধর্মপদের 'দণ্ডবর্গ' পড়ব।
অনুশীলনমূলক কাজ |
মঙ্গল শব্দের অর্থ শুভ বা ভালো। আমরা নিজের ও অন্যের শুভ বা ভালো হোক কামনা করে থাকি। একে মঙ্গল কামনা বলে। অনেক সময়ই মনে প্রশ্ন জাগে, আসলে কীসে বা কী করলে মঙ্গল হয়? মানুষ নানা রকম আচরণ বা চিহ্নকে মঙ্গল ও অমঙ্গল সূচক মনে করে থাকে। যেমন: কোনো কাজে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অনেকে ডান পা আগে বাইরে দেওয়াকে মঙ্গল মনে করে। অনেকে ভরা কলসসহ মেয়ে দেখলে মঙ্গল বা শুভ হয় বলে মনে করে। অনেকে কাক ডাকলে অশুভ হয় মনে করে ইত্যাদি।
গৌতম বুদ্ধের সময়েও লোকেরা কীসে মঙ্গল হয় তা নিয়ে আলোচনা করত। কেউ বলত, ভালো কিছু দেখলে মঙ্গল হয়। কেউ বলত, দেখার মধ্যে মঙ্গল নেই, শোনার মধ্যেই মঙ্গল। আবার, কেউ বলত, শোনার মধ্যে মঙ্গল নেই, মঙ্গল আছে ঘ্রাণ নেওয়ার মধ্যে, স্বাদ নেওয়ার মধ্যে কিংবা স্পর্শ করার মধ্যে। এভাবে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতো। মানুষের পাশাপাশি দেবতাদের মধ্যেও মঙ্গল নিয়ে তর্ক বিতর্ক হতো। কিন্তু এতে কোনো সমাধান হলো না। তখন তাবতিংশ স্বর্গের দেবতারা একত্র হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে গেলেন। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁদের কথা শুনে একজন দেবপুত্রকে মর্ত্যলোকে ভগবান বুদ্ধের কাছে গিয়ে এসব বিষয় জিজ্ঞাসা করার জন্য পাঠালেন। ভগবান বুদ্ধ তখন শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন। দেবপুত্রসহ অন্য দেবতারা বুদ্ধকে বন্দনা নিবেদন করে মঙ্গল কী জানতে চাইলেন। তার উত্তরে ভগবান বুদ্ধ দেবতা ও মানুষের উপকারের জন্য মঙ্গলসূত্র দেশনা করেন। তিনি মঙ্গলসূত্রে আটত্রিশ প্রকার মঙ্গলের কথা বলেন। এভাবেই 'মঙ্গলসূত্রের' উৎপত্তি হয়।
অনুশীলনমূলক কাজ |
১. বহুদেবা মনুস্সা চ, মঙ্গলানি অচিন্তযুং
আকঙ্খমানা সোথানং ব্রহি মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: বহু দেবতা ও মানুষ স্বস্তি কামনা করে কীসে মঙ্গল হয় তা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু কীসে মঙ্গল হয় তা কেউই সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারেননি।
আপনি দয়া করে দেবতা ও মানুষের মঙ্গলসমূহ ব্যক্ত করুন।
২. অসেবনা চ বালানং, পন্ডিতানঞ্চ সেবনা,
পুজা চ পূজনীযানং, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: মূর্খ লোকের সেবা না করা, জ্ঞানী লোকের সেবা করা এবং পূজনীয় ব্যক্তির পূজা করা উত্তম মঙ্গল।
৩. পতিরূপ দেসবাসো চ, পুর্ব্বে চ কতপুঞতা,
অত্তসম্মাপণিধি চ, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: (ধর্মমত পালনের উপযোগী) প্রতিরূপ দেশে বাস করা, পূর্বকৃত পুণ্যের প্রভাবে প্রভাবান্বিত থাকা এবং নিজেকে সম্যক পথে পরিচালিত করা উত্তম মঙ্গল।
8. বাহু সচ্চঞ্চ সিপ্লঞ্চ, বিনযো চ সুসিদ্ধিতো,
সুভাসিতা চ যা বাচা, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: বহু শাস্ত্রে জ্ঞানলাভ করা, বিবিধ শিল্প শিক্ষা করা, বিনয়ী ও সুশিক্ষিত হওয়া এবং সুভাষিত বাক্য বলা উত্তম মঙ্গল।
৫. মাতাপিতু উপট্ঠানং, পুত্তাদারস সঙ্গহো,
অনাকুলা চ কম্মস্তা, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: মাতা ও পিতার সেবা করা, স্ত্রী ও পুত্রের উপকার করা এবং নিষ্পাপ ব্যবসা ও বাণিজ্যের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা উত্তম মঙ্গল।
৬. দানঞ্চ ধম্মচরিযা চ, ঞাতকানঞ্চ সঙ্গহো,
অনবজানি কম্মানি, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: দান দেওয়া, ধর্মাচরণ করা, জ্ঞাতিগণের উপকার করা এবং সদ্ধর্মে অপ্রমত্ত থাকা উত্তম মঙ্গল।
৭. আরতি বিরতি পাপা, মজ্জপানা চ সঞমো,
অল্পমাদো চ ধম্মেসু, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: কায়িক ও মানসিক পাপকাজে অনাসক্তি, শারীরিক ও বাচনিক পাপ থেকে বিরতি, মদ্যপানে বিরত থাকা এবং অপ্রমত্তভাবে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করা উত্তম মঙ্গল।
৮. গারবো চ নিবাতো চ, সন্তুষ্ঠী চ কতঞতা
কালেন ধম্মসবণং, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: গৌরবনীয় ব্যক্তির গৌরব করা, তাদের প্রতি বিনয় প্রদর্শন করা, প্রাপ্ত বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকা, উপকারীর উপকার স্বীকার করা ও যথাসময়ে ধর্ম শ্রবণ করা উত্তম মঙ্গল।
৯. খন্তী চ সোবচসস্তা, সমণানঞ্চ দস্সনং,
কালেন ধম্মসাকচ্ছা, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: ক্ষমাশীল হওয়া, গুরুজনের আদেশ পালন করা, শ্রমণদের দর্শন করা, যথাসময়ে ধর্ম শ্রবণ করা উত্তম মঙ্গল।
১০. তপো চ ব্রহ্মচরিযঞ্চ চ, অরিযসচ্চান দস্সনং,
নিব্বানং সচ্ছিকিরিযা চ, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: তপশ্চর্য ও ব্রহ্মচর্য পালন করা, চারি আর্যসত্য হৃদয়ঙ্গম করা এবং পরম নির্বাণ সাক্ষাৎ করা উত্তম মঙ্গল।
১১. ফুস লোকধম্মেহি, চিত্তং যস্স ন কম্পতি,
অসোকং বিরজং খেমং, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: লাভ ও অলাভ, যশ ও অযশ, নিন্দা ও প্রশংসা, সুখ ও দুঃখ এই আট প্রকার লোকধর্মে অবিচলিত থাকা, শোক না করা, লোভ,
দ্বেষ ও মোহের মতো কলুষতা থেকে মুক্ত থাকা এবং নিরাপদ থাকা উত্তম মঙ্গল।
১২. এতাদিসানি কত্বান, সব্বথমপরাজিতা
সব্বত্থ সোথিং গচ্ছত্তি, তং তেসং মঙ্গলমুত্তমং।
বাংলা অনুবাদ: এসব মঙ্গলকর্ম সম্পাদন করলে সর্বত্র জয় লাভ করা যায় এবং সর্বত্র নিরাপদ থাকা যায় - এগুলো তাঁদের (দেব-মনুষ্যের) উত্তম মঙ্গল।
অনুশীলনমূলক কাজ |
মঙ্গলসূত্রে বুদ্ধ ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে মঙ্গল সাধনের উপায় নির্দেশ করেছেন। সূত্রটি পাঠ করলে দেখা যায়, নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশ সাধনে মঙ্গলসূত্রের উপদেশসমূহের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। মঙ্গলসূত্রের প্রতিটি উপদেশে মঙ্গল সাধনের উপায় নির্দেশ করা হয়েছে।
সূত্রে বলা আছে, পণ্ডিত বা জ্ঞানী ব্যক্তির সেবা করতে হবে, মুর্খ লোককে সেবা করা যাবে না। পূজনীয় ব্যক্তির সেবা করলে মঙ্গল সাধিত হয়। সদ্ধর্ম আচরণ করা যায় এমন দেশে বসবাস করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ যে দেশে সৎভাবে জীবনযাপন করা যায়, সে দেশে বসবাস করলে মঙ্গল সাধিত হয়।
নানারূপ শাস্ত্র ও বিদ্যা অর্জন করে সুশিক্ষিত হতে হবে। সুশিক্ষিত ব্যক্তির বড় গুণ বিনয় ও ভদ্রতা। মঙ্গলসূত্রে বিনয়ী হতে ও সুভাষিত বাক্য বলতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরূপ নির্দেশনা মেনে চললে মঙ্গল সাধিত হয়।
মাতা-পিতা সন্তানদের অনেক কষ্ট করে লালন পালন করেন। মাতা-পিতার কারণেই আমরা পৃথিবীর আলো দেখি। বিবেকসম্পন্ন মানুষমাত্রই মাতা-পিতার সেবা করা পবিত্র কর্তব্য। স্ত্রী-পুত্রের প্রতিও কর্তব্য পালন করতে হয়। এতে মঙ্গল সাধিত হয়।
সৎ ব্যবসা ও চাকরি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করলে মঙ্গল সাধিত হয়। দান করা, ধর্মাচরণ করা, আত্মীয়- পরিজনের উপকার করা এবং ধর্ম পালনে অবিচল থাকলে মঙ্গল সাধিত হয়।
কায়িক ও মানসিক পাপকাজ হতে বিরত থাকতে হবে। মাদক সেবন না করে অপ্রমত্তভাবে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের মঙ্গল সাধিত হয়।
গৌরবনীয় ব্যক্তির গৌরব করা, তাঁদের যথাযথ সম্মান ও বিনয় প্রদর্শন করা, নিজের যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা, উপকারীর উপকার স্বীকার করা এবং যথাসময়ে ধর্ম শ্রবণ করলে মঙ্গল সাধিত হয়।
ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ, সকলকে ক্ষমাশীল হতে হবে। গুরু বা শিক্ষকের নির্দেশ প্রতিপালন করতে হবে।
শ্রমণদের দর্শন ও যথাসময়ে ধর্মালোচনা করতে হবে। এভাবে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে মঙ্গল সাধিত হয়।
বৌদ্ধ ধর্মের পরম লক্ষ্য নির্বাণ। কুশলকর্ম সম্পাদন করে নির্বাণ পথে অগ্রসর হতে হয়। এজন্যই মঙ্গলসূত্রে তপস্যা, ব্রহ্মচর্য পালন ও চতুরার্য সত্য উপলব্ধি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে মঙ্গল সাধিত হয়।
ইহজাগতিক লাভ-অলাভ, যশ-অযশ, নিন্দা-প্রশংসা, সুখ-দুঃখ এই আট প্রকার লোকধর্মে অবিচল থাকতে পারলে মঙ্গল সাধিত হয়। শোক, পরিতাপ, লোভ, দ্বেষ, মোহ- এ সবই ক্ষতিকর। এসব থেকে মুক্ত হতে পারলে মঙ্গল সাধিত হয়।
উল্লিখিত কুশলকর্ম জীবনে অনুশীলন করলে মানুষের মঙ্গল সাধিত হয়। মঙ্গলসূত্রের প্রতিটি নির্দেশনা মানব জীবনে অনুসরণযোগ্য। এই নির্দেশনাসমূহ প্রকৃত অর্থেই ব্যক্তি ও সমাজের মঙ্গল সাধনের উপায় নির্দেশ করে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
'দণ্ড' অর্থ শাস্তি। অন্যায় বা অপরাধ করলে শাস্তি দেওয়া হয়। শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য অপরাধ করার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু শাস্তি অনেক সময় অপরাধের পরিমাণ না কমিয়ে আরও অপরাধ করার ইচ্ছা জাগায়। আবার ভুল করে নিরাপরাধ ব্যক্তি শাস্তি পেলে আরও অন্যায় হয় এবং মনঃকষ্ট বৃদ্ধি পায়। দণ্ড বা শাস্তি প্রদান করে অন্যকে কষ্ট দিলে নিজেরও কষ্ট ভোগ করতে হয়। জীবন সকলের কাছেই প্রিয়। অনেক সময় মৃতুদণ্ড প্রদান করা হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রদান একটি চরম সিদ্ধান্ত। যিনি দন্ড প্রদান করেন তিনি বিচারক। তাঁকে জ্ঞানী হতে হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি অনেক কিছু বিবেচনা করে শাস্তি বা দণ্ড প্রদান করে থাকেন। দণ্ড বিষয়ে ধর্মপদের দশম অধ্যায়ে চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। বুদ্ধের বর্ণিত এই ধর্মপোদেশ 'দণ্ডবর্গ' নামে অভিহিত। এ বর্গে বুদ্ধ দণ্ডের প্রচলিত ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। তিনি শাস্তি প্রদানের সময় শাস্তিভোগকারীর কষ্ট ও মনোবেদনা উপলব্ধি করার কথা বলেছেন। শান্তির জন্য শাস্তি প্রদান নয় বরং চিত্তশুদ্ধি আনয়ন করতে পারলে অন্যায় অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব। হত্যার বদলে হত্যা, আঘাতের বদলে প্রত্যাঘাত কখনো শান্তি আনতে পারে না। একসময় মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধ জেতবন বিহারে অবস্থান করেন। তখন দুজন ভিক্ষুর মধ্যে উপবেশন ও শয়ন নিয়ে বিরোধ বা মতানৈক্য সৃষ্টি হলে তা নিরসন বা মীমাংসা করার লক্ষ্যে বুদ্ধ দণ্ড বর্গের ভাষিত গাথাগুলো দেশনা করেন। এটাই দণ্ডবর্গের মূল উৎস বা উৎপত্তির কারণ।
দণ্ডবগ্ন (পালি)
১. সব্বে তসন্তি দণ্ডস সব্বে ভাযন্তি মচুনো,
অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয্য ন ঘাতযে।
বাংলা অনুবাদ: সবাই দণ্ডকে ভয় করে, মৃত্যুর ভয়ে সবাই সন্ত্রস্ত। নিজের সঙ্গে তুলনা করে কাউকে আঘাত কিংবা হত্যা করো না।
২. সব্বে তসন্তি দণ্ডস সব্বেসং জীবিতং পিযং
অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয্য ন ঘাতযে।
বাংলা অনুবাদ: সকলেই দণ্ডকে ভয় করে, জীবন সবার প্রিয়, সুতরাং নিজের সঙ্গে তুলনা করে কাউকে প্রহার কিংবা আঘাত করো না।
৩. সুখকামানি ভুতানি যো দন্ডেন বিহিংসতি,
অত্তনো সুখমেসানো পেচ্চ সো ন লভতে সুখং।
বাংলা অনুবাদ: নিজের সুখের জন্য যে সুখপ্রত্যাশী প্রাণীগণকে দণ্ড দেয়, পরলোকে সে কখনো সুখ লাভ করতে পারে না।
৪. সুখকামানি ভুতানি যো দণ্ডেন হিংসতি,
অত্তনো সুখমেসানো পেচ্ছ সে লভতে সুখং।
বাংলা অনুবাদ: নিজের সুখের জন্য যিনি অপর সুখকামী প্রাণীগণকে দণ্ড দেন না, পরলোকে তিনি নিশ্চয়ই সুখ লাভ করবেন।
৫. মা' বোচ ফরুসং কঞ্চি বুত্তা পটিবদেয্যু তং,
দুস্থাহি সারম্ভকথা পটিদণ্ডা ফুসেয্যু তং।
বাংলা অনুবাদ: কাউকে কটু কথা বলবে না। যাকে কটু কথা বলবে, সে-ও তোমাকে কটু কথা বলতে পারে। ক্রোধপূর্ণ বাক্য দুঃখকর, সেজন্য দণ্ডের প্রতিদণ্ড তোমাকে স্পর্শ করবে।
৬. সচে নেরেসি অত্তানং কংসো উপহতো যথা,
এস পত্তো'সি নিব্বানং সারম্ভো তে ন বিজ়তি।
বাংলা অনুবাদ: আঘাত পাওয়া কাঁসার মতো যদি নিজেকে সহনশীল রাখতে পারো, তবেই তুমি নির্বাণ লাভ করবে, ক্রোধ থেকে জন্ম নেওয়া বাদবিসম্বাদ আর থাকবে না।
৭. যথা দণ্ডেন গোপালো গাবো পাচেতি গোচরং
এবং জরা চ মচ্চু চ আয়ুং পাচেন্তি পাণিনং।
বাংলা অনুবাদ: রাখাল যেমন দণ্ডাঘাতে গরু তাড়িয়ে গোচারণভূমিতে নিয়ে যায়, সেরূপ জরা ও মৃত্যু প্রাণীদের আয়ু তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
৮. অথ পাপানি কম্মানি করং বালো ন বুঝতি,
সে হি কম্মেহি দুম্মেধো অগ্নিদঢ়ো'ব তপতি।
বাংলা অনুবাদ: নির্বোধ লোক পাপকাজ করার সময় তার ফল সম্বন্ধে অজ্ঞ থাকে, সুতরাং দুষ্ট লোক নিজের কর্মের দ্বারা আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা ভোগ করে।
৯. যো দণ্ডেন অদণ্ডেসু অল্পদুঠেসু দুস্সতি,
দসন্নমঞঞতরং ঠানং খিল্পমেব নিগচ্ছতি।
বাংলা অনুবাদ: অদণ্ডনীয় (নির্দোষ) ও নিরাপরাধ ব্যক্তির প্রতি যে ব্যক্তি দণ্ড প্রদান করে, সে ব্যক্তি সহসা দশবিধ অবস্থার মধ্যে অন্যতর (অবস্থা) লাভ করে।
১০. বেদনং ফরুসং জানিং সরীরস চ ভেদনং,
গরুকং বা'পি আবাধং চিপেং'ব পাপুণে।
বাংলা অনুবাদ: (তার) তীব্র বেদনা, ক্ষয়ক্ষতি, শরীরের অঙ্গচ্ছেদ, কঠিন ব্যাধি বা চিত্তবিক্ষেপ প্রাপ্ত হয়।
১১. রাজতো বা উপস্সগ্গং অন্তস্থানং'ব দারুণং
পরিযং'ব ঞাতীনং, ভোগানং'ব পভঙ্গুরং।
বাংলা অনুবাদ: (সে) রাজরোষ বা দারুণ অপবাদের সম্মুখীন হয়, (তার) জ্ঞাতিক্ষয় হয় এবং সম্পদ নাশ হয়।
১২. অথব'স অগারানি অগ্নি ডহতি পাবকো,
কায়স্স ভেদা দুষ্পঞো নিরয়ং সো'জ্জতি।
বাংলা অনুবাদ: (তার) ঘর আগুনে পুড়ে যায়, মৃত্যুর পর সে মন্দবুদ্ধি ব্যক্তি নরকে উৎপন্ন হয়।
১৩. ন নগচরিযা ন জটা ন পঙ্কা, নানাসকা থন্ডিলসাযিকা বা,
রজো চ জল্লং উকুটিকল্পধানং, সোধেন্তি মচ্চং অবিতিন্নক্তত্থং।
বাংলা অনুবাদ: নগ্নচর্যা, জটাধারণ, কাদালেপন, অনশন, যজ্ঞভূমিতে শয়ন, ধূলি বা ছাইমাখা, কঠিন উৎকট তপস্যায় নিজেকে পীড়ন করা,
এসব জপতপ কিছুতেই সংশয়ভরা মানুষকে পবিত্র করতে পারে না।
১৪. অলঙ্কতো চেপি সমং চরেয্য, সন্তো দন্তো নিয়তো ব্রহ্মচারী,
সব্বেসু ভূতেসু নিধায দণ্ডং, সো ব্রাহ্মণো সো সমণো স ভিষ্ণু।
বাংলা অনুবাদ: অলংকৃত হয়েও যিনি শান্ত, দমিত ও সব সময় ব্রহ্মচারী, যিনি সকল প্রাণীর প্রতি হিংসাহীন হয়ে শান্তিময় আচরণ করেন-তিনি ব্রাহ্মণ, তিনিই শ্রমণ এবং তিনিই ভিক্ষু।
১৫. হিরীনিসেধো পুরিসো কোচি লোকস্মিং বিজ্ঞতি,
যো নিন্দং অল্পবোধতি অস্সো ভদ্রো কসামিব।
বাংলা অনুবাদ: সুশিক্ষিত ঘোড়া যেমন কশাঘাতকে এড়িয়ে চলে, সেইরূপ লজ্জাবোধে নিন্দনীয় কাজ এড়িয়ে চলেন এমন লোক কয়জন আছেন?
১৬. অসো যথাভদ্রো কসানিবিঠো, আতাপিনো সংবেগিনো ভবাথ,
সদ্ধায সীলেন চ বিরিযেন চ, সমাধিনা ধম্মবিনিচ্ছযেন চ;
সম্পন্নবিজ়াচরণা পতিতা, পহস্লথ দুষ্কৃমিদং অনপকং।
বাংলা অনুবাদ: বেতের আঘাতে ভদ্র (সুশিক্ষিত) ঘোড়া যেমন বেগবান হয়, সেরূপ তোমরা শক্তিমান ও বেগযুক্ত হও।
শ্রদ্ধা, শীল, শৌর্য, সমাধি ও ধর্মজ্ঞান দ্বারা বিদ্যাচরণসম্পন্ন ও স্মৃতিমান হয়ে অপরিমেয় দুঃখরাশি হতে মুক্ত হও।
১৭. উদকং হি নযন্তি নেত্তিকা, উসুকারা নমযন্তি তেজনং,
দারুং নমযন্তি তচ্ছকা, অত্তানং দমযন্তি সুপ্তা।
বাংলা অনুবাদ: জল সেচনকারী যেমন জলকে ইচ্ছামতো চালিত করেন, শর-নির্মাতা যেমন শরকে সোজা করেন, কাঠমিস্ত্রি (তক্ষক)
যেমন কাঠের টুকরাকে ইচ্ছামতো আকার দান করেন, ব্রতচারী ব্যক্তিও তেমনি নিজেকে দমন করেন।
অনুশীলনমূলক কাজ |
জীবন সকলেরই প্রিয়। জগতের সকল প্রাণী মৃত্যু ও দণ্ডকে ভয় পায়। তাই অপরকে নিজের মতো ভেবে কাউকে আঘাত করা উচিত নয়। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য দুর্মতি পরায়ণ ব্যক্তি অপরকে দণ্ড দ্বারা আঘাত ও হত্যা করে। কিন্তু দণ্ড প্রয়োগে প্রকৃত সুখ অর্জন করা যায় না। দণ্ডের পরিণাম ভয়াবহ। এতে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত হয়, শত্রুতা বৃদ্ধি পায়। নিরাপরাধ ব্যক্তিকে দণ্ড প্রয়োগ গুরুতর অপরাধ এবং পাপও বটে। যে দুর্নীতি-পরায়ণ ব্যক্তি নিরাপরাধ ব্যক্তি, কল্যাণ মিত্র বা সাধু ব্যক্তিকে দণ্ড প্রয়োগ করে বা মিথ্যা নিন্দা আরোপ করে, পরিণামস্বরূপ সে দশবিধ দুঃখজনক অবস্থার অন্যতম অবস্থাপ্রাপ্ত হয়। যথা: ১) সে শিরঃপীড়া, শূলরোগ প্রভৃতি দ্বারা তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করে; ২) তার স্বীয় শ্রমলব্ধ সম্পত্তির অপচয় হয়; ৩) তার শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়; ৪) তার শরীরের একাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত, চক্ষুহানি, মেরুদণ্ড বিকৃতি, কুষ্ঠ প্রভৃতি গুরুতর রোগ উৎপন্ন হয়; ৫) সে উন্মাদ, রোগগ্রস্ত হয়; ৬) তাকে রাজাপরাধী সাব্যস্ত করে রাজকর্ম ত্যাগে বাধ্য করা হয়; ৭) সে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে জড়িত হয়ে নিদারুণ কলঙ্কের ভাগী হয়; ৮) তার আশ্রয়দাতা জ্ঞাতিগণের বিয়োগ হয়; ৯) তার সঞ্চিত ধন-সম্পদ নষ্ট হয় এবং ১০) তার গৃহ আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়।
এই ভয়াবহ পরিণাম হতে রক্ষা পেতে হলে দণ্ড ত্যাগ করে মৈত্রীভাব পোষণ করা উচিত। বুদ্ধ বলেছেন, শত্রুতা দ্বারা শত্রুতা প্রশমিত হয় না। মৈত্রী বা ভালোবাসা দ্বারা শত্রুতা প্রশমিত হয়। যিনি নিজের সুখের জন্য অপর সুখকাতর জীবের প্রতি হিংসা করেন না, দণ্ড প্রয়োগ করেন না, তিনি মৃত্যুর পর পার্থিব ও স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করে পরিশেষে পরম নির্বাণসুখ লাভ করেন। তাই সকলের দণ্ড ত্যাগ করা উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
মঙ্গলসূত্র ও দণ্ডবর্গে বহু শিক্ষণীয় বিষয় আছে। মঙ্গলসূত্রে মানুষকে জ্ঞানী লোকের সেবা করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞানী লোককে অনুসরণ করতে হবে। তাঁর নির্দেশনা মানতে হবে। সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপনের উপযোগী দেশে বসবাস করতে বলা হয়েছে। ভালো কাজের কথা স্মরণ করে নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। নানা বিষয়ে বিদ্যা অর্জন, বিনয়ী ও সুশিক্ষিত হওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। সব সময় সুন্দরভাবে কথা বলতে হবে, যাতে কেউ কষ্ট না পায়। মাতা-পিতা গুরুজনের সেবা করতে হবে। সত্রী-পুত্রের উপকার করতে হবে। সৎ ব্যবসা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। দান-কর্ম ও আত্মীয়-স্বজনের উপকার করতে হবে। সদ্ধর্মে অবিচল থাকতে হবে। শারীরিক বা মানসিক পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। মাদকদ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে। কীর্তিমান সফল ব্যক্তিদের সাফল্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাঁদের প্রতি সম্মান জানাতে হবে। অল্পে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। উপকারী ব্যক্তির উপকার স্বীকার করতে হবে। যথাসময়ে ধর্মকথা শুনতে হবে। ক্ষমাপরায়ণ হতে হবে। ধৈর্য ও প্রতিপদ বাক্য চর্চা করতে হবে। ভিক্ষু-শ্রমণ দর্শন ও ধর্ম আলোচনা করতে হবে। ধ্যান, সমাধি ও চারি আর্যসত্য অনুধাবন করতে হবে। নির্বাণ পথে পরিচালিত হতে হবে। লাভ-ক্ষতি, খ্যাতি-অখ্যাতি, নিন্দা বা প্রশংসা, সুখ-দুঃখ সর্বক্ষেত্রেই চিত্তকে স্থির রাখা, শোক না করা, লোভ, হিংসা, মোহ প্রভৃতি থেকে মুক্ত থাকার অনুশীলন করে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করতে হবে। যাঁরা এ সকল মেনে জীবনযাপন করে, তাঁরা সব সময় সর্বক্ষেত্রে জয়লাভ করতে পারে। মঙ্গলসূত্রে বুদ্ধ এ সমস্ত কাজকে উত্তম বা শ্রেষ্ঠ মঙ্গল বলেছেন। মঙ্গলসূত্রে ওপরে বর্ণিত বিষয়ে শিক্ষা লাভ করতে পারি।
দণ্ডবর্গ পাঠেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করা যায়। দণ্ডবর্গ হতে আমরা শিক্ষা পাই যে দণ্ড প্রয়োগ বা শাস্তি দ্বারা অন্যায় প্রবণতা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা সম্ভব নয়। অন্যায়কারীকে সৎ পথে পরিচালিত করতে পারলেই অপরাধ প্রবণতা হ্রাস করা সম্ভব। কারো প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে শাস্তি প্রদান করা উচিত নয়। শাস্তি প্রদানের সময় শাস্তির পরিণাম বিবেচনা করতে হয়। অপরকে কষ্ট দিয়ে নিজে সুখী হওয়া যায় না। প্রচলিত আইনে অপরাধীর জন্য যে শাস্তির বিধান আছে তা প্রয়োগে কর্তৃপক্ষকে খুবই সতর্ক হতে হবে। কারণ বলা আছে, ভুল বিচারে একাধিক দোষী ব্যক্তি ছাড়া পেয়ে যাক, কিন্তু একজনও নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন বিনা দোষে শাস্তি না পায়।
দণ্ডবর্গে প্রতিহিংসা ত্যাগ করে মৈত্রী প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কারো প্রতি কটুকথা, ক্রোধপূর্ণ বাক্য বা প্রতিদণ্ড প্রদান করা হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
নিরাপরাধ ব্যক্তিকে শাস্তি দিলে ইহজগতে এবং পরজন্মে নরক-যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ। মৈত্রী অনুশীলনের মাধ্যমে শত্রুকেও বন্ধু করা সম্ভব। কারও প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিহিংসাবশত দণ্ড বা শাস্তি প্রদান করা উচিত নয়। আত্মসংযম, সহনশীলতা, মৈত্রী ও ক্ষমা অনুশীলন করা উচিত।
দণ্ডবর্গ অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করে শাস্তি প্রদানের পরিণাম অনুধাবন করতে শিক্ষা দেয়।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more